২৮টি সোনা জিতেও জোটেনি চাকরি, পথের ধারে চিপস বেচে পেট চালান প্যারাশুটার দিলরাজ

১৩৬ কোটির দেশ। এখানে কত প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদের জন্ম হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেন তাঁরা। কিন্তু প্রয়োজন ফুরোলে তাঁদের কথা কেউ মনে রাখে না। ক্রিকেটের কৌলিন্য আর ক’টা খেলারই বা জোটে। তাও কিছুটা নাম-যশ হয় ফুটবল,টেনিস বা ব্যাডমিন্টন তারকাদের। কিন্তু বাকিরা মিশে যান আমজনতার ভিড়ে। তেমনই একজন আন্তর্জাতিক স্তরের প্যারা শুটার দিলরাজ কৌর। দেশের প্রথম মহিলা প্যারাশুটারও বটে।

দেহরাদুনের বাজারে তাঁর পরিচয়, একজন সামান্য চিপস আর বিস্কুট বিক্রেতা। এর বেশি তাঁর ব্যাপারে কেউ জানতেও চায়নি কখনও। তাও নিজের কোনও দোকান নেই। রাস্তার ধারে একপাশে ছোট্ট ডালা নিয়ে বসে বিস্কুট,চিপস, স্ন্যাকস বিক্রি করছেন তিনি।

শহরের মানুষের সঙ্গে তাঁর ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক। দিলরাজ যেচে কাউকে নিজের পরিচয় দিতে যান না! তাই তাঁর কৃতিত্ব, পারদর্শিতা আর দেশের জন্যে এনে দেওয়া সম্মানের কথা অজানাই থেকে গেছে।

তবে পথের ধারের দিলরাজ কৌরকে চিনতে ভুল করেনি সাংবাদিকের চোখ। দেশকে তিনি কী দিয়েছেন, সবকিছু তুলে আনে সংবাদমাধ্যম। বুঝিয়ে দেয়,এখানে যোগ্য মানুষের সমাদর নেই। বাড়িতে ২৮ সোনা, ৮ রূপো ও ৩ ব্রোঞ্জ পদক। অথচ এই প্রতিভাময়ী প্যারাশুটারকে সংসার চালানোর জন্য বাজারে চিপস বিক্রি করতে হচ্ছে!

দিলরাজ কৌরের বয়স এখন ৩৪। যে সময় তিনি শুটিংয়ের জগতে পা রেখেছিলেন তখন এদেশে মেয়েদের এই খেলায় দেখা যেত না। ২০০৫-এ শুটিং শুরু করেছিলেন তিনি, প্যারাশুটার হিসাবে। দেশের প্রথম মহিলা প্যারা-শুটার তিনি। কিন্তু খেলার দুনিয়া ছাড়ার পর তাঁর এখন নিতান্তই করুণ অবস্থা। ২০১৯ থেকে বিপদ যেন তাঁর নিত্যসঙ্গী। বাবা মারা যাওয়ার পর ,ভাইও মারা যান। করোনা লকডাউনের জন্য চূড়ান্ত আর্থিক সঙ্কটের মধ্যে পড়ে তাঁর পরিবার। জাতীয় স্তরে ৩০টি পদকজয়ী প্যারাশুটার শেষ পর্যন্ত মা গুরবিতের সঙ্গে বাজারে চিপস বিক্রি করতে বাধ্য হন। চোখের জল মুছে দিলরাজ বলেন, ‘প্রথমে বাড়ির সামনে গোবিন্দগড়ে বিক্রি করতাম। কিন্তু সেখানে লোকজনের যাতায়াত কম ছিল । তখন মা বলেন, আমরা দেহরাদুনে গান্ধী পার্কের সামনে বসেই চিপস বিক্রি করব। বাবার ডায়ালিসিসের জন্য অনেকগুলো টাকা খরচ হয়েছিল। এর পর ভাই ছাদ থেকে পড়ে গেল। মাথায় গুরুতর চোট পেল। ওর চিকিত্সায় আমরা কোনও ত্রুটি রাখিনি। তবুও ওকে বাঁচাতে পারলাম না। ওর চিকিৎসায় আমাদের কম করে এক কোটি টাকা খরচ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই ফেব্রুয়ারিতে ও মারা গেল। এখন আর আমাদের হাতে কোনও টাকা-পয়সা নেই। আমরা ধার-দেনায় ডুবে আছি।’ ভাড়া বাড়িতে কোনওরকমে দিন গুজরান করছেন মা ও মেয়ে।

ক্রীড়াক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এদেশে বহু অ্যাথলেট চাকরি পেয়েছেন। কিন্তু দিলরাজের ভাগ্যে একটা চাকরিও জোটেনি। হয়ত তোষামোদ করতে পারেননি। আর এখানেই তাঁর ক্ষোভ। দিলরাজ বলেন,‘রাজস্থান, হরিয়ানায় অ্যাথলেটরা চাকরি পায়। আমার গোটা শুটিং কেরিয়ার সাফল্যে ভরা। অনেক পদক জিতেছি। আমার কোচিং সার্টিফিকেট রয়েছে। আমি আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছি। এর পরও কি আমি একটা চাকরি পাওয়ার যোগ্য নই! আমার সরকারি কোনও সাহায্য চাই না। নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি হয়তো আমি পেতে পারতাম।’

দেশের জন্য যে মেয়ে একদিন প্রাণ ঢেলে দিল, দেশ তাকে দেখবে না? প্রশ্ন খ্যাতির আড়ালে থাকা,দেশের প্রথম আন্তর্জাতিক প্যারা শুটারের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *