দরিদ্র্যতাকে জয় করে জীবন যুদ্ধে জয়ী শুভাশিস মুখোপাধ্যায় আজও হাসির ওপর নাম

টানটান উত্তেজনাময় থ্রিলার হোক কিংবা রোমান্টিক প্রেমের গল্প, অল্পবিস্তর হাসির খোরাক না থাকলে সিনেমাটা যেন ঠিক জমে না। আর নিপুণ দক্ষতার সঙ্গে যারা পর্দায় দর্শকের হাসির রসদ যুগিয়ে চলেন, তারাই কমেডিয়ান (Commedian), মানুষের মন ভালো করার কারিগর। টলিউডে (Tollywood) ইদানিং এমন কমেডিয়ান অনেকেই রয়েছেন। তবে ৯০ এর দশকের বাংলা সিনেমা যে বাঙালি কমেডিয়ানকে ছাড়া অচল ছিল, তিনিই হলেন শুভাশিস মুখোপাধ্যায় (Shuvashish Mukherjee)।

দীর্ঘ প্রায় ৩ দশক ধরে পর্দায় তার উপস্থিতি দর্শককে আনন্দ দিয়েছে। তার সাবলীল অভিনয়, কমিক সেন্স, কমিক টাইমিং গুরুগম্ভীর দর্শককেও প্রাণ খুলে হাসতে বাধ্য করেছে। একটা সময় ছিল যখন কমিক দৃশ্যে অভিনয় মানেই পরিচালকেরা আগে শুভাশিসের (Subhasish Mukhopadhyay) খোঁজ করতেন। তবে পর্দায় যাকে বরাবর এত হাসি-খুশি, এত মজার মানুষ বলে মনে হয়, আদতে কিন্তু তার জীবনটা এত মজার নয়।

শুভাশিসের জন্ম হয়েছিল কলকাতাতে। স্কটিশ চার্চ স্কুল থেকেই স্কুল জীবনের পড়াশোনা করেছেন তিনি। ওই স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশের পর শেঠ আনন্দরাম জয়পুরিয়া কলেজ থেকে বি.কম পাস করেন শুভাশিস। ছোটবেলা থেকেই তার ক্রিকেটের প্রতি বেশ আগ্রহ ছিল। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলের স্বপ্নপূরণের অর্থ ছিল না বাবার কাছে। প্রসঙ্গত, শুভাশিসের বাবা ছিলেন একজন চাটার্ড একাউন্টেন্ট।

কলেজ জীবন শেষ হওয়ার পরপরই চাকরিতে ঢুকে যান তিনি। একটি কসমেটিকস কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছিলেন শুভাশিস। কিছুদিন সেই কাজ করার পর একটি মুদ্রণ সংস্থায় চাকরিতে ঢোকেন শুভাশিস। অভিনয় জীবনে তিনি প্রথম ব্রেক পান ১৯৮৭ সালে। টলিউডের পরিচালক পূর্ণেন্দু পাত্রীর ‘ছোটো বকুলপুরের যাত্রী’ ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন শুভাশিস। সেই সুযোগ অবশ্য হাতছাড়া করেননি শুভাশিস।

প্রথম ছবিতেই দুর্দান্ত অভিনয় করে দর্শকের মন জয় করে নেন তিনি। শুরু হয় তার নতুন জীবন। দীর্ঘ প্রায় ৩ দশক ধরে ‘ভালোবাসা’, ‘বকুল প্রিয়া’, ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘গুরু শিষ্য’, ‘সংসার সংগ্রাম’, ‘দাদা ঠাকুর’, ‘সজনী’, ‘সূর্য’, ‘আক্রোশ’, ‘রাজমহল’, ‘মেঘে ঢাকা তারা’, ‘খোকাবাবু’, ‘গোগোল-এর কীর্তি’র মত অসংখ্য ছবিতে কাজ করেছেন শুভাশিস। বেশিরভাগ ছবিতেই তাকে কমেডিয়ান চরিত্রে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে। তবে পরবর্তী কালে কমেডিয়ান ইমেজ ভেঙে ভিন্ন স্বাদের চরিত্রেও অভিনয় করেছেন শুভাশিস।

২০১২ সালে টেনিদার মতো চরিত্রে তার অভিনয় দর্শক আজও মনে রেখেছেন। এছাড়াও ভিন্ন স্বাদের চরিত্র হিসেবে হালফিলের ‘মহালয়া’ ছবিতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চরিত্রে, ‘ব্রহ্মা জানেন গোপন কম্মটি’ ছবিতে গোঁড়া পুরোহিতের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। বড় পর্দা ছাড়াও ছোটপর্দাতেও সমান সাবলীল শুভাশিস মুখোপাধ্যায়। ‘রাখি বন্ধন’, ‘কলের বউ’, ‘জড়োয়ার ঝুমকো’, ‘খেলাঘর’, ‘তারানাথ তান্ত্রিক’ এর মতো একাধিক ধারাবাহিকে অভিনয় করতে দেখা গিয়েছে তাকে।

এছাড়াও অবশ্য বেশ কিছু ওয়েব সিরিজেও তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। হালফিলে স্টার জলসার পর্দায় ‘খেলাঘর’ ধারাবাহিকের নায়ক ‘শান্টু’র বাবার চরিত্রে অভিনয় করছেন শুভাশিস। এক দরিদ্র, বৃদ্ধ, সৎ, আদর্শবাদী মাস্টারমশাইয়ের চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকে আরও একবার মুগ্ধ করেছে। উল্লেখ্য অভিনয় জগতে তার অভিনয় দেখে অনেকেই মনে করতেন যে শুভাশিস অভিনেতা মনু মুখোপাধ্যায়েরই ছেলে। তবে আদতে তা কিন্তু সত্যি নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *